কবিতায় জাগতিক, মহাজাগতিক, মানবিক, আত্মিক যে কোনও পথই এসে
মিশতে পারে। এইসব পথের বিন্যাস কবি ভেদে ভিন্ন হয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের
কবিতারও নিজস্ব রূপবন্ধন আছে। যে কোনও কবিতাই তো কবির স্বগতোক্তি – মোনোলগ।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কোনও কোনও কবির ক্ষেত্রে মোনোলগই হয়ে ওঠে ইউনিভার্সাল
কোরাস। তাঁর কবিতার অন্তর্লীন স্পন্দন, মানবজাতির স্পন্দনের সঙ্গে মিলেই অনুরণন
সৃষ্টি করে। নিজের বাকশস্যে আত্ম পেরিয়ে তিনি বহু অপর হয়ে ওঠেন। আর এই ‘more beingful’ অপরদের
গেঁথেই তৈরি হয় তাঁর অনুভূতিমালা। প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকেই তিনি কাব্যিক বাস্তবতায়
রূপান্তরিত করেন। কিন্তু সেখানেও থাকে য়ুটোপিয়া কিংবা অন্য বাস্তবতার ইশারা। তা না
হলে কিছু দৃশ্যের আবর্জনা-স্তূপ হয়ে থাকত তাঁর কবিতা। কিন্তু
তিনি এমন এক আজকের কথা বলেছেন, যেখানে রামধনু মেলে ধরে আগামীকাল।
আলোচনার জন্যে বেছে নিলাম বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মুখোশ
কবিতাটা। এই কবিতা তাঁর ২২-২৩ বছরের প্রথম যৌবনে লেখা। প্রথমে কবিতাটা একবার পড়া
যাক -
কান্নাকে শরীরে নিয়ে যারা রাত জাগে,
রাত্রির লেপের নিচে কান্নার শরীর
নিয়ে করে যারা খেলা,
পৃথিবীর সেই সব যুবক যুবতী
রোজ ভোরবেলা
ঘরে কিংবা রেস্তোরাঁয় চা দিয়ে
বিস্কুট খেতে-খেতে
হঠাৎ আকাশে ছোড়ে দু’চারটি কল্পনার
ঢেলা :
এবং হাজারে কয় রান ক’রে আউট হ’য়ে
গেছে
ভুলে গিয়ে তারা হয় হঠাৎ অদ্ভুত।
যুবতীকে মনে হয়, হয়তো বা সেরে গেছে
সকল অসুখ,
যুবককে মনে হয়, কোনো-এক রহস্যের
দূত
কার যেন স্মৃতিমুখ পাঠায়েছে আমাদের
মতো কোনো প্রণয়ীর কাছে ;
সুন্দর কি কুত্সিত জানিনা, তবু
জানি মার্চেন্টের মারে নেই এই সব খুঁত।
দিনগুলি বাসি বড়ো, রাত্রি বড়ো
বিবর্ণ একাকী
প্রেমিক কি উদ্বাস্তুর মতো এক
সমস্যায় নিতান্তই মুর্খ হ’য়ে গেছে :-
আমার কি আসে যায়, তুড়ি মেরে
একজামিনে দিয়ে যাবো ফাঁকি!
অথবা কবিতা দিয়ে সমর্থন জানাবো
তোমাকে,
হে প্রেমিক, হে উদ্বাস্তু, তোমাদের
দুঃখে আমি গ’লে হবো নদী !
হে দিন, হে কালরাত্রি ;
না-হয় আগলাবো আমি তোমাদের
দুর্দিনের গদি।
তোমরা নির্বোধে হাতে স্মৃতিমুখ
খুঁজে-খুঁজে পড়ে যাবে যখন অসুখে,
তোমাদের দুঃখে আমি ম’রে যেতে রাজি
আছি - কারো দুঃখে মরা যায় যদি
কী আশ্চর্য! সেই ছেলে আমার দর্শন
শুনে তবু
অর্ধেক বিস্কুট ফেলে রেস্তোরান্ট থেকে
চ’লে গেল। সেই মেয়ে সিনেমার
বিজ্ঞাপনে, ভিড়ে
ডুবে গেল, তারপর কী যেন বলল
সঙ্গিনীকে ?-
মনে হ’লো হেমিংওয়ে মম্ নিয়ে ওদের
বিবাদ
আজন্ম চলেছে যেন, বন্ধুত্বটা
কোনোমতে আছে তবু টিঁকে!
হঠাৎ পড়ল চোখে কাগজের এডিটোরিয়াল
আমেরিকা ভালো, চীন ভালো ...
ট্রুম্যান পাঠাবে অন্ন আমাদের কাল :
হৃদয় জুড়ালো।
হে যুবক, হে যুবতী, পৃথিবীতে তোমাদের
কতটুকু দাম ?
কান্নাকে শরীরে নিয়ে কার ঘরে কয়
ফোঁটা দিয়ে গেলে আলো ?
কবিতাটা আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে গত শতকের পাঁচেক দশকে শহর
কলকাতার এক রেস্তোরাঁয় – সাতসকালে যেখানে মধ্যবিত্ত যুবক-যুবতী ভিড় করে,
চা-বিস্কুট খায়, পড়ে খবরের কাগজ। সাহিত্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি থেকে ক্রিকেট –
সবকিছু নিয়েই আলোচনা, তর্কবিতর্ক হয়।
প্রথম স্তবকে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা ও দেশভাগ পরবর্তী
বাঙালি মধ্যবিত্ত ইয়ং জেনারেশনের মনোপ্রদেশে আলো ফেলতে চাইছেন কবি। এখানে কবি বা কবিতার
উত্তম-পুরুষ সেই তরুণদেরই একজন। তাই তিনি তাদের আর্থসামাজিক ও মানসিক অবস্থাকে
জেনারেশন গ্যাপ ছাড়াই উপস্থাপিত করতে পারছেন অনায়াসে। দুর্দশাক্লিষ্ট হয়েও এই যুব
সমাজের তখন অনেক স্বপ্ন, অনেক কল্পনা।
দ্বিতীয় স্তবক থেকেই প্রকৃতপ্রস্তাবে রেস্তোরাঁর মধ্যে ঢোকা
হচ্ছে। তখন সেখানে যুবক-যুবতীকে দেখে মনে হচ্ছে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন
বিজয় হাজারে যে সদ্য কম রান করে আউট হয়ে গেছেন, তা ভুলে গেছে তারা। যুবতী যেন
নিজের সব দুঃখ অতিক্রম করেছে। আর যুবক যেন রহস্যের দূত হয়ে সমসাময়িক অন্য তরুণদের
স্মৃতিতে উদ্ভাসিত করছে কোনো মুখচ্ছবি। আমাদের মনে রাখতে হবে, সেই যুগে জনপরিসরে
ছেলে-মেয়েদের মেলামেশা সবে শুরু হয়েছে। তবে ভালোলাগার সেই স্মৃতিমুখ সুন্দর না
কুত্সিত – এ নিয়ে না ভেবে কবিতার উত্তম-পুরুষের মনে পড়ছে বিজয় মার্চেন্টের
ক্রিকেট শটের সৌন্দর্য, যেখানে খুঁত নেই কোনও। কিন্তু এই সৌন্দর্য ছুঁয়েই পরক্ষণে
তাঁর যুগযন্ত্রণা – ‘দিনগুলি বাসি বড়ো, রাত্রি বড়ো বিবর্ণ একাকী’। এই ‘বিবর্ণ
একাকী’ শব্দবন্ধে প্রেমের, আকাঙ্ক্ষার হাতছানি - ইরোটিক বর্ণালীর চকিত উদ্ভাস। তখন
স্মৃতিমুখের আশ্রয় থেকে বিচ্যুত প্রেমিক উদ্বাস্তুর মতো – যে কিনা এই একমাত্র
সমস্যায় নিতান্তই মুর্খ হয়ে রয়েছে। একজন উদ্বাস্তুও যে ফেলে-আসা ঘরদোরের নস্টালজ্যায়
বারবার আক্রান্ত হন। উত্তম-পুরুষ অবশ্য জীবনের এই পরীক্ষা তুড়ি মেরেই ফাঁকি দিতে
চান। কিন্তু নিজে ফাঁকি দিলেও প্রজন্মের বিপন্নতা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তখন এই
বিপন্নতা প্রতিস্থাপিত করতে চান কবিতা দিয়ে। এই দুর্দিন তিনি কবিতায় বহন করে
আগলাতে চান নিজের প্রজন্মকে। আর এতটাই প্রাণপণ তাঁর এই ক্রিয়াশীলতা যে কিঞ্চিত
তির্যকতায় বলে ওঠেন – ‘তোমাদের দুঃখে আমি মরে যেতে রাজি আছি – কারো দুঃখে মরা যায়
যদি’। পরের স্তবকেও প্রবাহিত হয় তির্যকতা। ছেলেটি অর্ধেক বিস্কুট ফেলে রেস্তোরাঁ
থেকে চলে যায়। ‘অর্ধেক বিস্কুট’ শব্দবন্ধ যেন ব্যঞ্জনায়িত করছে ছেলেটির প্রেমের
অসফলতা। আর মেয়েটি তখন রেস্তোরাঁ থেকে বাইরের ভিড়ে, সিনেমার বিজ্ঞাপনে মনোনিবেশ
করে। এবার আমরা জানতে পারি, তার সঙ্গে আর একজন মেয়ে আছে। আর সেই সঙ্গিনীকে সম্ভবত
রাগত স্বরেই সে কিছু একটা বলছে। বোঝা যায়, আকাঙ্ক্ষাপূরণ না হওয়ায় সেও মানসিকভাবে
কিছুটা বিপর্যস্ত। এবার সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে উত্তম-পুরুষ নজর দেন। আন্তর্জাতিক
ও দেশীয় প্রতিকূল পরিস্থিতির তির্যক বিপ্রতীপে অন্তিম দুই পঙক্তিতে তিনি ফিরে আসেন যুবক-যুবতীর প্রসঙ্গে। প্রশ্ন
তোলেন, জগতের কাছে তাদের স্বকেন্দ্রিক অনুভবের মূল্য কতটা, ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা
নিয়ে থাকলে অন্যদের কীভাবে তারা আলোকসন্ধান দেবে ?
হয়তোবা ওই যুবক আর কবিতার উত্তম-পুরুয একজনই মানুষ।
সেক্ষেত্রে উত্তম-পুরুষের মতো যুবকটিও কবির
পার্সোনা। তাঁর মুখোশ। অন্তর ও বাহিরের দ্বন্দ্বকে পরিস্ফূট করতেই কবি হয়তো নিজেকে
ভেঙেছেন বিষয়ী ও বিষয়ে। সেই জন্যেই কবির দর্শন শুনে ছেলেটি অর্ধেক বিস্কুট ফেলে
চলে যায়। হয়তো কোখাও যায় না। মুখোশ থেকে মুখে ফিরে আসে।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা জলের মতোই স্বচ্ছ। কিন্তু এই
স্বচ্ছতা অতলস্পর্শী। এই স্বচ্ছতায় ডুব না দিলে
তাঁর পাঠক হওয়া যাবে না।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতই স্বচ্ছতা এই আলোচনাটিরও মূল সম্পদ।
ReplyDeleteবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতই স্বচ্ছতা এই আলোচনাটিরও মূল সম্পদ।
ReplyDelete