Wednesday, August 28, 2019

দেবলীনা চক্রবর্তী: 'অস্থির হয়ো না; শুধু, প্রস্তুত হও





কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতা আজকের দিনে কতটা প্রাসঙ্গিক সে বিষয়ে লেখার আগে কবির কবিতা লিখন নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয় ।  
   তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে প্রতিনিয়ত সম্মোহিত হয়েছি , আবেশে বিভোর হয়েছি । এত বৈচিত্র্য , এত আলো ছায়ার কারুকাজ ও কি ভীষণ তীক্ষ্ণ ও বলিষ্ঠ উপস্থাপন যা সত্যিই তাঁকে তাঁর সমসাময়িক কবিদের থেকে পৃথক করে , শুধু তাই নয় তাঁর জীবন দর্শনও স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয় ।  
 আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্ধ সময়ে তাঁর কিছু কবিতার বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি ।  
 যেমন — 
“অস্থির হয়ো না;
শুধু, প্রস্তুত হও!”

“তোমার কাজ
আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়-- 
আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা।

অস্থির হয়ো না,
শুধু প্রস্তুত হও।”
     
             আবার তিনি লিখছেন —

  “যখন দুর্দিন ঘনিয়ে আসে
তখন মাথা ঠান্ডা রাখাই সবচেয়ে জরুরী কাজ। ”--------
“দুর্দিন কখনও চিরদিন থাকে না,”

            অর্থাৎ তাঁর লেখা এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে , ক্ষোভ - দুঃখ - বিষণ্ণতা সমাজ জীবনে যতই আসুক , যতই আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করার চেষ্টা করুক না কেন কিন্তু কখনই হতাশা বা নিরাশার অধিনতা স্বীকার না করে , তাকে অন্তরের শক্তি , ধৈর্য্য ও সাহস দিয়ে জয় করতেই হবে। কবির মতে জীবনের যত রকম 
রঙ মৃত্যুরও তত রকম রঙ । আলো-অন্ধকার , দিন - রাত্রি যেমন অনিবার্য সত্য , ঠিক তেমনই 
আশা- নিরাশাও একে অপরের সাথে জড়িত ।
তাকে জয় করতেই হবে । 
 কবি তাঁর ‘এই স্বাধীনতা প্রাণহীন ’ কবিতাটি ১৯৭৪ সালে লিখেছেন , কিন্তু আজকের সমাজ জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই লেখাটি কতটা প্রাসঙ্গিক তা কবিতাটির ছত্রে ছত্রে ফুঠে উঠেছে । তিনি লিখেছেন —

  “------ এই স্বাধীনতা প্রাণহীন , ধাতব শব্দের উচ্চারণ শুধু। 
 যতদূর যাওয়া যায় শ্মশান ও শবদেহ , নৈঃশব্দ ও অন্ধকার ,
  এ আমার দেশ !
 নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় , বুক এমন পাথর ,
 অথচ পাথরে একদিন দুর্বাশ্যাম কিশলয় জন্ম নেয় , আমার তেমন কোন উত্তরণ , 
 এই দেশে , ঘোর উন্মাদের প্রলাপের মত মনে হয় । ”

 আজ ৭৩ টি স্বাধীনতা পেড়িয়ে এসেও আমরা কতটা আক্ষরিক অর্থে স্বাধীন , তা কি শুধুই 
ধাতব শব্দের উচ্চারণ নয় ! আজও এই কবিতার প্রতিটি লাইন প্রাসঙ্গিক নয় !

    তবুও তাঁর আদর্শ , সমাজ তন্ত্রের পরিবর্তনের উপর বিশ্বাস বা আস্থার প্রতিফলন তাঁর কালি ও কলম , যা আজও আমাদের উত্তপ্ত করে , ভাবায় ।  তাঁর নির্লোভ ও প্রচার বিমুখ কবিতা যাপন আমাদের প্রাণিত করে ।  
    
       তাঁর বহু কবিতা আজও বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ভগ্নদশা ও দুর্দশার মুখোশ টেনে খুলে দিতে সক্ষম । তাঁর কবিতাগুলি সংক্ষিপ্ত হলেও গভীর অর্থবহ ও সংকেতপূর্ণ।  
  তাঁর “রাজা আসে যায়” কবিতাটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ — 
   
রাজা আসে যায়          রাজা বদলায় 
নীল জামা গায়           লাল জামা গায় 
এই রাজা আসে        ওই রাজা যায় 
 জামা কাপড়ে             রং বদলায় ——
                                দিন বদলায় না !

  এই কবিতাগুলি আজও জীবন্ত । প্রতিটি শব্দ ও অন্তর্নিহিত অর্থগুলো যেন নিজস্ব মহিমায় ফুটছে , জ্বলছে - জ্বালাচ্ছে , কাঁদছে ও অধিকার পাওয়ার আশায় প্রতিনিয়ত লড়াই করছে ।


No comments:

Post a Comment

একঝলকে

সম্পাদকীয়-র পরিবর্তে

সে চেয়েছিলো একটি সত্যিকারের প্রেমের কবিতা লিখতে। তার তো একটাই জীবন। মানুষের জীবনে প্রেমের চেয়ে নির্মল পিপাসার জল আর কী থাকতে পারে? ...

পাঠকের পছন্দ