কবি
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতা আজকের দিনে কতটা প্রাসঙ্গিক সে বিষয়ে লেখার
আগে কবির কবিতা লিখন নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয় ।
তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে প্রতিনিয়ত
সম্মোহিত হয়েছি , আবেশে বিভোর হয়েছি । এত বৈচিত্র্য , এত আলো ছায়ার কারুকাজ ও কি
ভীষণ তীক্ষ্ণ ও বলিষ্ঠ উপস্থাপন যা সত্যিই তাঁকে তাঁর সমসাময়িক কবিদের থেকে পৃথক
করে , শুধু তাই নয় তাঁর জীবন দর্শনও স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয় ।
আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্ধ সময়ে তাঁর কিছু কবিতার
বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি ।
যেমন —
“অস্থির হয়ো
না;
শুধু,
প্রস্তুত হও!”
“তোমার কাজ
আগুনকে ভালোবেসে
উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়--
আগুনকে
ব্যবহার করতে শেখা।
অস্থির হয়ো
না,
শুধু
প্রস্তুত হও।”
আবার তিনি লিখছেন —
“যখন দুর্দিন ঘনিয়ে আসে
তখন মাথা
ঠান্ডা রাখাই সবচেয়ে জরুরী কাজ। ”--------
“দুর্দিন
কখনও চিরদিন থাকে না,”
অর্থাৎ তাঁর
লেখা এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে , ক্ষোভ - দুঃখ - বিষণ্ণতা সমাজ জীবনে যতই আসুক , যতই
আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করার চেষ্টা করুক না কেন কিন্তু কখনই হতাশা বা নিরাশার অধিনতা
স্বীকার না করে , তাকে অন্তরের শক্তি , ধৈর্য্য ও সাহস দিয়ে জয় করতেই হবে। কবির
মতে জীবনের যত রকম
রঙ মৃত্যুরও
তত রকম রঙ । আলো-অন্ধকার , দিন - রাত্রি যেমন অনিবার্য সত্য , ঠিক তেমনই
আশা- নিরাশাও
একে অপরের সাথে জড়িত ।
তাকে জয়
করতেই হবে ।
কবি তাঁর ‘এই স্বাধীনতা প্রাণহীন ’ কবিতাটি ১৯৭৪ সালে
লিখেছেন , কিন্তু আজকের সমাজ জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই লেখাটি কতটা
প্রাসঙ্গিক তা কবিতাটির ছত্রে ছত্রে ফুঠে উঠেছে । তিনি লিখেছেন —
“------ এই স্বাধীনতা প্রাণহীন , ধাতব শব্দের উচ্চারণ
শুধু।
যতদূর যাওয়া যায় শ্মশান ও শবদেহ , নৈঃশব্দ ও অন্ধকার ,
এ আমার দেশ !
নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় , বুক এমন পাথর ,
অথচ পাথরে একদিন দুর্বাশ্যাম কিশলয় জন্ম নেয় , আমার তেমন
কোন উত্তরণ ,
এই দেশে , ঘোর উন্মাদের প্রলাপের মত মনে হয় । ”
আজ ৭৩ টি স্বাধীনতা পেড়িয়ে এসেও আমরা কতটা আক্ষরিক অর্থে
স্বাধীন , তা কি শুধুই
ধাতব শব্দের
উচ্চারণ নয় ! আজও এই কবিতার প্রতিটি লাইন প্রাসঙ্গিক নয় !
তবুও তাঁর আদর্শ , সমাজ তন্ত্রের
পরিবর্তনের উপর বিশ্বাস বা আস্থার প্রতিফলন তাঁর কালি ও কলম , যা আজও আমাদের
উত্তপ্ত করে , ভাবায় । তাঁর নির্লোভ ও প্রচার বিমুখ কবিতা
যাপন আমাদের প্রাণিত করে ।
তাঁর বহু কবিতা আজও বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ভগ্নদশা
ও দুর্দশার মুখোশ টেনে খুলে দিতে সক্ষম । তাঁর কবিতাগুলি সংক্ষিপ্ত হলেও গভীর
অর্থবহ ও সংকেতপূর্ণ।
তাঁর “রাজা আসে যায়” কবিতাটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ —
রাজা আসে যায় রাজা বদলায়
নীল জামা গায় লাল জামা গায়
এই রাজা আসে ওই রাজা যায়
জামা কাপড়ে রং বদলায় ——
দিন বদলায় না !
এই কবিতাগুলি আজও জীবন্ত । প্রতিটি শব্দ ও অন্তর্নিহিত
অর্থগুলো যেন নিজস্ব মহিমায় ফুটছে , জ্বলছে - জ্বালাচ্ছে , কাঁদছে ও অধিকার পাওয়ার
আশায় প্রতিনিয়ত লড়াই করছে ।

No comments:
Post a Comment